পত্রসাহিত্য / কিঞ্জল রায়চৌধুরী

[একটি চিঠি – নিজেরই এক গল্পের নায়িকা প্রিয়দর্শিনীকে ]

প্রিয়দর্শিনী,

উপন্যাসটা এখনও মাঝপথে থমকে আছে দেখে হয়তো তোমার অভিযোগের শেষ নেই। লিখতে গিয়ে কলম অথবা কিপ্যাড স্পর্শ করলেই সেটা আমি টের পাই।  তোমারই মতো অধীর অপেক্ষায় আছেন আরও অনেকেই। কেননা তারাও  ইতিমধ্যে  জেনেছেন আমার এই উপন্যাসটার কথা। তাদেরও ফেরানো যায়না আর! কিন্তু কী করি বলোতো ! বাকি চরিত্রগুলো যে নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্বে অস্থির। তাদের বিশ্বাস করানোই কঠিন – মানুষের মনেও সালোকসংশ্লেষের বিক্রিয়া হতে পারে। ।  ডক্টর প্রশান্ত ধীরজ যেদিন আমার মধ্যে ক্লোরোফিলের গন্ধ পেলেন , সূত্রপাত সেখান থেকেই।! রাতে কেউ আমার কাছে ঘেঁষতে চায়না ,  পাছে কার্বনডাইঅক্সাইড ছড়াই,  সেই ভয়ে ! অথচ দিনের বেলাতেও কি অক্সিজেন পেতে আমার কাছে ছুটে আসে কেউ! লিটনদা কাফকা পড়ে আমার পরিস্থিতি বোঝবার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। পাড়াপড়শি থেকে অফিসের লোকজন সব্বাইকে কনভিন্স করতে চেয়েও বিফল হচ্ছে বারবার। হবেই! কারণ আমি জানি উপন্যাসের মাঝপথে তোমার এন্ট্রি না হওয়া পর্যন্ত কেউ কিচ্ছু বিশ্বাস করতে পারবেনা। কোনঠাসা ‘আমি’টা বেশ ভালোই বুঝতে পারছে –“সকল লোকের মাঝে বসে/ নিজের মুদ্রাদোষে /আমি একা হতেছি আলাদা..”

সেদিন ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’ উপন্যাসের সোনিয়াকেও স্বপ্নে দেখলাম!  ঘুম ভাঙতেই চেহারাটা ঝাপসা…কিন্তু ওর কথাগুলো স্পষ্ট কানে বাজছে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস দস্তয়েভস্কি নিশ্চয়ই ‘ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট’এর দ্বিতীয় পর্ব লেখার পরিকল্পনা করেছিলেন। উপন্যাসের শেষটা পড়লে সেটা অনেকের মনে হতে পারে। অন্তত আমার তো মনে হয়েছে।

জানো প্রিয়দর্শিনী! সোনিয়া ঠিক তোমার মতোই সরল ভঙ্গিমায় আমাকে  জিজ্ঞেস করে বসল – কেন আমি আরেকটু মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষাগুলো দিলামনা! উত্তরটা দিতেই পারি তবে সেটা প্রশ্নের তুলনায় জটিল হয়ে যাবে না তো?  যদি বলি গাছ, হ্যাঁ ওই একটা গাছই প্রথমত এর জন্য দায়ী!  প্রথম পোকাটা নাড়িয়ে দিয়েছিল সালোকসংশ্লেষ। যা কিনা শুধুমাত্র গাছই পারে। আর কেউ কেন নয়? যত ‘কেন’র সূচনা তারপর থেকেই। কথা ছিল নিশ্চিন্তে শ্বাস প্রশ্বাস নিয়ে সমীকরণ মুখস্থ করে খাতায় উগরে দেবার। তা আর হলনা। ফিজিক্স পরীক্ষার দিন, সে আরেক মজা। বন্ধুরা অবাক –  তুই লাইট পড়েছিস? আমরা তো চ্যাপ্টারটা খুলেও দেখিনি।  একটু হেল্প করে দিস ভাই!  বলেছিলাম পরীক্ষায় গুলি মার! তোরা সিনেমা দেখবি?  একেবারে রিয়্যাল সিনেমা দেখাবো।

–এই ক্লাসরুমে?

–হ্যাঁ এখানেই। নে দ্যাখ…..পকেট থেকে বেরিয়ে এসেছিল সাদা কাগজ আর ম্যাগনিফাইং গ্লাস। এরপরেও বন্ধুরা লাইট চ্যাপ্টার খুলবেনা তা কি হয়? খুলিয়েছিলাম। অন্তত দুএকজনকে খুব কাছ থেকেই। মাধ্যমিক পড়তে পড়তে যাকে মাধ্যমিক পড়াতেও হয়, হয়তো  তার সবকিছুই খানিকটা অনিশ্চিত। অ্যাকাডেমির বাকি সিঁড়িগুলো কখনো টপকাতে পারবো কিনা জানা নেই। তবে সেদিন ক্লাসরুমে সবার মাঝখানে দাঁড়িয়ে সাদা কাগজে আতসকাচের Refraction-এ  নিজের হাতে যে দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছিলাম,  সেই নেশার ফাঁদে আটকা পড়ে গেলাম নিজেই।

ভোরবেলা হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাই। কেন জানিনা আমার আদি কবির কথা  মনে পড়ে যায়! সেই ক্রৌঞ্চবিরহী বাল্মিকীর কথা। ব্যাধের নিক্ষিপ্ত তীরে আহত পাখির ছটফটানি! সঙ্গিনী পাখির তাকে ঘিরে তীব্র বেদনা! এই তো ছিল আদিকবির প্রথম শ্লোক লেখার অনুপ্রেরণা! “মা নিষাদ!”….. সেই তীব্র বেদনাই রূপ নিল কাব্যে, রূপ নিল আখ্যানে। অথচ তার একটু আগেই কী মনোরম পরিবেশটা ছিল বলোতো! ক্রৌঞ্চযুগল উড়ে চলেছিল নিজের আনন্দে। গাছে এসে বসেছিল, ডুবে গেছিল পরস্পরের সৌন্দর্যের মগ্নতায়! কবিও তো সেটা দেখে উপভোগ করছিলেন! কিন্তু না, সৃষ্টির প্রেরণা দিল ব্যথা..কাতরতা! ভেবে দেখো বাল্মীকির মনে এর একটা পূর্ব প্রস্তুতি চলছিলই। রত্নাকরের পাপের ভাগ যখন কেউ নিতে রাজি হলোনা, প্রত্যাখ্যানের সেই বেদনাই তো তাকে দূরে বনানীর কাছে পাঠিয়ে দিল লোকালয়ের বাইরে। রাজপথ থেকে অনেক অনেক দূরে…এই মন তো জমি খুঁজছিলই! ক্রৌঞ্চপাখির ব্যথা আসলে তো সেই আদি কবিরই নিজস্ব মর্ম যন্ত্রণায় লীন!

আমরাও তো সেই ব্যথাই আজও  বহন করে চলেছি!  তফাৎ শুধু সময়ের। সময় বড় জটিল। জটের মতোই পাকানো তার দুর্ভেদ্য জাল।  ভোরবেলা ঘুম ভাঙলে বুকে কিসের যেন ভার চেপে বসে। কে নেবে আমার সে ভার?  কেউ তো রাজি নয়! দু একটি আত্মজন যদিও বা নিতে জানে, তাদের জন্যেও দুশ্চিন্তা হয় – আমার দুঃসহ বোঝা তাদের ওপরে চাপিয়ে নিশ্চিন্ত থাকি কীকরে? রাজপথ ছেড়ে,  লোকালয় ছেড়ে যদি বনানীর মধ্যে আশ্রয় নিতে পারতাম – তবে হয়তো প্রাণের অক্ষর সঠিকভাবে মূর্ত হতে পারত! তা আর পারছি কই?

আমার অসমাপ্ত উপন্যাসটা এগিয়ে নিয়ে চলার দায়িত্ব তাই তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম। কোন পরিচ্ছেদে তুমি আসবে, তুমিই ঠিক করে নাও। আমি অপেক্ষায় –দস্তয়েভস্কির  সোনিয়ার মতো তুমিও একদিন এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়াবে ! আর আমি একটানে নিজের মুখোশ খুলে, পাপবিদ্ধ খোলস ছিঁড়ে রেখে দেবো তোমার পায়ের কাছে…..

উপন্যাসের বাকি কটা সাদা পাতা খুলে বসে রইলাম …..

ইতি —তোমার অক্ষর শিল্পী কিঞ্জল

Published by সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা

যাত্রা শুরু ২০১৯ সালের ১লা বৈশাখ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: