পুস্তক সমালোচনা

আলোচক: গোবিন্দ মোদক

গ্রন্থ: “ইন্দ্রাবতী, তুমি কেঁদো না, গর্জে ওঠো”।
গ্রন্থকার: সৌমিত্র মজুমদার।
প্রকাশক: দুর্বাসা প্রকাশনা, কলকাতা – 31 
গ্রন্থটির বিষয়বস্তু: ছত্তিশগড় রাজ্যের বস্তর এলাকায় বসবাসকারী আদিবাসীদের সংগ্রামের ঐতিহাসিক দলিল।
আলোচক: গোবিন্দ মোদক।

          বিশ্বের সমস্ত শোষিত-বঞ্চিত-পীড়িত-অসহায় মানুষদেরকে উৎসর্গ করে আলোচ্য বইটি লেখা হয়েছে যারা যুগে যুগে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে স্বাধিকার রক্ষার তাগিদে গর্জে উঠেছেন এবং তা সত্ত্বেও অত্যাচারিত হয়েছেন। নিজেদের ন্যায্য-প্রাপ্য অধিকারটুকু নিয়ে তাদের জীবন রক্ষার লড়াই এবং তথাকথিত শাসকের দল যেভাবে সেই লড়াইয়ের বিরুদ্ধে দমন নীতি গ্রহণ করেছে মূলত সেটিই এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য বিষয়। বস্তুতপক্ষে বাজারচলতি আর দশটা বই থেকে এই বইটির প্রকৃতি সম্পূর্ণরূপেই আলাদা। শুধুমাত্র বই পড়ার জন্য নয়, যাঁরা বই পড়ে প্রকৃত ভালো বই পড়ার অনুভূতি পেতে চান তাঁদের জন্য এটি একটি আদর্শ বই। 


          গ্রন্থকারের কথা মতো বইটি দীর্ঘ পনেরো বছরের সাধনার ফসল, এবং এই উক্তি যে নিছক উক্তি নয় তার প্রমাণ এই ৬২ পৃষ্ঠার স্বল্প আয়তনের বইটির প্রতিটি পাতায় পাতায়। লেখক প্রথমবার বস্তর গিয়েছিলেন ১৯৭২ সালে। তখন এখানকার আদিবাসীদের নিজস্ব সভ্যতা-সংস্কৃতি এবং এলাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য লেখককে মুগ্ধ করেছিল। তারপর তিনি বারবার ওখানে গিয়েছেন, থেকেছেন, আদিবাসীদের সঙ্গে মিশেছেন, তাদেরকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ পেয়েছেন ; তারপর একান্তই মনের তাগিদে তিনি রচনা করেছেন তাঁর গবেষণাধর্মী গ্রন্থ: “ইন্দ্রাবতী তুমি কেঁদো না গর্জে ওঠো”। বস্তুতপক্ষে বস্তরের আর্থ-সামাজিক পটভূমিকায় ঐতিহাসিক তথ্য প্রমাণাদি এবং বর্তমানকালের বিভিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত করে লেখা এই বইটির জন্য কোনও ধন্যবাদই যথেষ্ট নয়। যে কোনও সনিষ্ঠ পাঠক বইটিকে সাগ্রহে নেবেন। 


          এবারে আমরা বইটির ভেতরে প্রবেশ করবো। ছত্তিশগড় রাজ্যের বস্তর এলাকায় ভারতের মোট আদিবাসীদের 87% বাস করে। কিছুদিন পূর্বে, ষাটের দশকেও তারা প্রায় নির্বস্ত্রই থাকতো। তখন ভারত স্বাধীন হলেও সভ্যতার প্রকৃত আলো কিন্তু সেখানে পৌঁছায় নি। কিন্তু যখনই সেই আলোর ছিটেফোঁটা বস্তর এলাকায় পৌঁছলো, তখনই শুরু হলো তথাকথিত সভ্য সমাজ ও আদিবাসীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ভয়-ভীতি, শোষণ-অত্যাচার, সংঘর্ষ আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বস্তরের ইতিহাস শোষিত বঞ্চিত অত্যাচারিত আদিবাসীদের বেঁচে থাকার জন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ইতিহাস যা আজও চলমান তথা বহমান। অথচ বস্তরের অধিবাসীদের সংস্কৃতি ধর্ম ভাষা আচার-বিচার খুবই সমৃদ্ধ। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় নদীকেন্দ্রিক এই বস্তর প্রদেশের সভ্যতার ইতিহাসও অনেক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস যা আমাদের কাছে অনেকটাই অজানা। আমরা যুগে যুগে দেখেছি নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে সমৃদ্ধ সভ্যতা। ইন্দ্রাবতী নদীর অববাহিকায়ও গড়ে উঠেছিল বস্তর সভ্যতা। কিন্তু তথাকথিত সভ্যতার করালগ্রাসে তা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে — বহুজাতিক আগ্রাসী সংস্থার জমিক্ষুধা, আদিবাসীদের শোষণ শাসন অত্যাচার এবং ছলে-বলে-কৌশলে আদিবাসীদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া, আদিবাসী মেয়েদেরকে ধর্ষণ, আদিবাসীর জীবনে দুর্দশা নামিয়ে আনা, ক্ষতি করা, লুঠতরাজ, সহজ সরল আদিবাসীদেরকে অন্যায়ভাবে ঠকানো — এই সমস্ত কাহিনী বর্ণিত হয়েছে ইন্দ্রাবতীর মুখের ভাষায়। ইন্দ্রাবতী শুধু নদী-ই নয়, সে দীর্ঘদিন ধরে বস্তর এলাকার উত্থান-পতনের এবং সংগ্রামের সাক্ষী। আর তার-ই মুখনিঃসৃত গ্রন্থটি পাঠে যে ভিন্নতর আস্বাদন, সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।


           বস্তর গ্রাম ছত্রিশগড়ের জগদলপুর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে। সেখানে হলবা, ভতরা, মুরিয়া, মাড়িয়া, ধুরবা, দোরলা প্রভৃতি জনজাতি বাস করে। তাদের নিজস্ব ভাষা হল্বি, অবুঝমারি, গদবী, মাতরী, দোরলী, গোণ্ড, পরজী ইত্যাদি। গ্রন্থটির নিবিষ্ট পাঠে পাঠক যে সমস্ত তথ্য জানতে পারবেন তা হলো বস্তরের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবধারা, তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক টান-পোড়েন, তাদের সমাজের আচার-বিচার, তাদের বিবাহের নিয়মকানুন, তাদের কামশাস্ত্র, তাদের সন্তান পালনের ব্যবহারিক শিক্ষা, তাদের সংস্কৃতি ইত্যাদি। তবুও কিন্তু বইটির মুখ্য অধ্যায় তা নয়, বইটির মুখ্য উপজীব্য হলো বস্তরের আদিবাসী সম্প্রদায়ের সংগ্রামের ঐতিহাসিক তাৎপর্য। আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই লড়াই আজকের নয়, সুদূর প্রাচীনকাল থেকে তাদের এই লড়াই জারি রয়েছে। তাদের প্রথম বিদ্রোহ ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে, যার নাম ছিল “ডোঙ্গর বিদ্রোহ”। পরবর্তীকালে তাদের দ্বিতীয় বিদ্রোহ ঠিক ১০০ বছর পর ১৮৭৬ খ্রিস্টাব্দে। এখানেই শেষ নয় — ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে যখন ইংরেজদের শাসন এবং শোষণ ভারতের বুকে দগদগে ঘায়ের সৃষ্টি করেছে তখন বস্তর এলাকার আদিবাসীদের তৃতীয় এবং ভয়াবহ এক বিদ্রোহ হয়। ইংরেজ সরকার সেই বিদ্রোহকে বীভৎস অত্যাচার, লুঠপাট, ধর্ষণ, ধ্বংস এবং অমানবিক অত্যাচারের মাধ্যমে দমন করে। কিন্তু আদিবাসীদের এই আন্দোলন পুরোপুরি থেমে যায় না, অজস্র লোক মারা যায় — ইন্দ্রাবতী নদীর জল লালে লাল হয়ে যায়, তবুও আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই চলতে থাকে। পরবর্তীকালে হয় “সলবা জুড়ুম” বিদ্রোহ — সেটি ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে। “সলবা জুড়ুম”- এর অর্থ হল শোধনের শিকার যা পরবর্তীকালে শোষণের শিকারে পরিণত হয় যেমনভাবে ইংরেজদের বণিকের মানদণ্ড একদা শাসকের রাজদণ্ডে পরিণত হয়েছিল।


           বহু ঐতিহাসিক তথ্য, সাংস্কৃতিক তথ্য, ভৌগোলিক তথ্য, রাজনৈতিক তথ্য এবং পরিসংখ্যান দিয়ে সাজানো গবেষণাধর্মী বইটি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্যাভারে ভারাক্রান্ত হয়েছে বটে, কিন্তু এছাড়া আদিবাসীদের এই সংগ্রামের পুরো ইতিহাস জানা সম্ভব হতো না। তবু সংগ্রামের ইতিহাস ছাড়াও রয়েছে বস্তরের কিছু উল্লেখযোগ্য আর্থ-সামাজিক দিক। বস্তরের ভূমিজুড়ে অনেক মূল্যবান খনিজ পদার্থ। সেখানে লৌহ আকরিক, বক্সাইট, অভ্র, বেরিল পাথর, গ্রাফাইট, টিন, অতি মূল্যবান ইউরেনিয়াম, কোরান্ডাম প্রভৃতি মূল্যবান খনিজ পদার্থ রয়েছে। রয়েছে অফুরন্ত মূল্যবান বনজ সম্পদ। এই সমস্ত সম্পদ ও খনিজের লোভে বহিরাগতরা, ব্যবসায়ীরা এবং দালালরা বারবার এসেছে এবং এই সহজ-সরল-সাধারণ আদিবাসীদেরকে ঠকিয়ে, তাদের শ্রমকে চুরি করে মুনাফা লুটেছে এবং তারা বিত্তশালী হয়ে উঠেছে। যুগে যুগে এভাবে প্রতারিত এবং অত্যাচারিত হতে হতেও বস্তরের আদিবাসীরা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তাদের নিজস্ব সভ্যতা এবং সংস্কৃতির নিয়ে যেখানে রয়েছে তাদের নিজস্ব গান, নিজস্ব নাচ, দন্ডামী-মাড়িয়া লোকনৃত্য, করসাড় লোকনৃত্য, ডণ্ডারী লোকনৃত্য, গেড়ী লোকনৃত্য, জনপ্রিয় ঘোটুল নৃত্য-গীত ইত্যাদি। 


          সরকারের তরফ থেকে অসংখ্য যোজনা এই আদিবাসীদের জন্য ইদানীং হয়েছে। কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য সরকার হাজারো যোজনা এদের জন্য লাগু করেছেন। স্বাধীনতার ৭৪ বছর পরে এটাই হয়তো এদের কিঞ্চিত চরম-প্রাপ্তি, কারণ একসময় তো এদের নুন-ভাতেরই যথেষ্ট অভাব ছিল। যাইহোক সমস্যার পুরোপুরি সমাধান না হলেও আদিবাসীদের জীবন আদিবাসীদের নিজস্ব ছন্দেই ছন্দিত হয় যেখানে অভাব আছে, দারিদ্র আছে, বঞ্চনা আছে, প্রতিকূলতা আছে, সংগ্রামের হাজারো দিক আছে। তাদের হাতে তৈরি সুন্দর সুন্দর কাঠের মূর্তি, আদিবাসীদের জীবনের জীবন্ত চিত্রায়ণ সুলভ মূল্যে ভ্রমণকারীর দল কিনে নিয়ে যায়। এখানকার তৈরি কোষাসিল্কের শাড়ি-কাপড় খুবই বিখ্যাত। তাছাড়া পাট দিয়ে তৈরি কুটিরশিল্প, পিতলের মূর্তি ইত্যাদিও ভীষণভাবে সংগ্রহযোগ্য। গ্রন্থকারকে ধন্যবাদ যে তিনি শুধু বস্তরের আদিবাসীদের সংগ্রামের দলিল-ই লেখেননি, লিখেছেন সেখানকার আর্থ-সামাজিক দিক, লিখেছেন তাদের অস্তিত্বের গভীর শিকড়ের কথা, লিখেছেন বিদ্রোহের কথা, লিখেছেন তাদের সহজ-সরল-সাধারণ জীবন-যাপনের কথা এবং মাটি কামড়ে থাকার লড়াই-এর প্রকৃত ইতিহাস যা আমাদের সভ্য জগতের কাছে অনেকটাই অজানা।এছাড়া বইটিতে রয়েছে বেশ কিছু আলোকচিত্র, আঁকা ছবি এবং পরিসংখ্যান চার্ট।


         আর একটি কথা না বললেই নয়। সেটি হচ্ছে-  বহু মৌলিক গবেষণা পুস্তক আকারে প্রকাশিত হবার পর সেটি পুরস্কারের মুখ দেখে। “ইন্দ্রাবতী তুমি কেঁদো না, গর্জে ওঠো” বইটি কোনও পুরস্কারের জন্য বিবেচিত হয়েছে কিনা কোথাও উল্লেখ নেই, তবে নিশ্চিত মনে হয় বইটি অবশ্যই পুরস্কারের যোগ্য। যে পরিশ্রম, যে ভালোবাসা, যে নিষ্ঠা, যে সততা এবং যে আন্তরিকতা দিয়ে ঐকান্তিক তাগিদে গ্রন্থকার বস্তরের অভিবাসীদের জীবন সংগ্রামের দলিল রচনা করেছেন তার জন্য কোন ধন্যবাদ-ই যথেষ্ট নয়। গ্রন্থটির বহুল প্রচার কামনা করা যেতেই পারে।

Published by সাহিত্যের সন্ধানে পত্রিকা

যাত্রা শুরু ২০১৯ সালের ১লা বৈশাখ

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s

%d bloggers like this: